হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ সামরিক হামলা এই অঞ্চলে একটি নতুন ও বিপজ্জনক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে ব্যাপক সতর্কতা দেখা দিয়েছে।
ইরাকি সূত্রগুলোর মতে, এই হামলার ফলে ইরাকের প্রতিরোধ গোষ্ঠী ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করবে। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে সৌদি আরবও সরাসরি এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।
অঞ্চলে যুদ্ধের নতুন ধাপ এবং ইরাক সরকারের জন্য কঠিন পরীক্ষা
আল-আখবার লিখেছে, কয়েক মাস ধরে ইরাকের প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র প্রশ্নে রাজনৈতিক বিরোধ এবং এসব গোষ্ঠীকে নিরস্ত্র করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপ চলছিল। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ হামলা ইরাকের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রতিরোধ গোষ্ঠীকে একত্রিত করেছে। তারা সবাই হাশদ আল-শাবি বাহিনীর অবস্থানে চালানো এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। এমনকি ইরাক সরকারও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এই হামলা আবারও প্রমাণ করেছে যে আঞ্চলিক সংঘাতের ক্ষেত্রে ‘নিরপেক্ষতা’ বা ‘ভারসাম্যপূর্ণ নীতি’ অনুসরণের বাগদাদের প্রচেষ্টা বাস্তবে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। ইরাক চাইলে নিরপেক্ষ থাকতে পারবে না।
এতে আরও বলা হয়, ইরাকের সামাজিক কাঠামো এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে তীব্র বিভাজন এমন একটি বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে আঞ্চলিক সংঘাতের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়া অত্যন্ত কঠিন, এমনকি অসম্ভব।
হামলার বিবরণ
গতকাল ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানায়, সৌদি আরবের সমন্বয়ে তারা হাশদ আল-শাবি বাহিনীর অস্ত্রগুদাম ও সরবরাহ লাইন লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ছিল, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনা এবং মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলার জন্য হাশদ আল-শাবি দায়ী।
এই হামলায় অন্তত ২০ জন হাশদ আল-শাবি সদস্য নিহত এবং ৩২ জন আহত হন।
হামলার পরপরই প্রধানমন্ত্রী ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক আলি আল-জাইদির সভাপতিত্বে ইরাকের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ইরাকের সার্বভৌমত্বের ওপর হামলার নিন্দা জানানো হয়।
জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় হামলার প্রমাণ সংগ্রহ ও নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহৃত না হয়, সে জন্য একটি নতুন নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়নেরও নির্দেশ দেওয়া হয়। বৈঠকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে অস্ত্র রাখার নীতি এবং আন্তর্জাতিক জোটের মিশন সমাপ্তির চুক্তি বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
ইরাক সরকারকে প্রতিরোধের আল্টিমেটাম
তবে সরকারের এই অবস্থান প্রতিরোধ গোষ্ঠী ও সাধারণ জনগণকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। তাদের মতে, শুধু নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেওয়া যথেষ্ট নয়।
ইরাকের ইসলামি প্রতিরোধ এক কঠোর ভাষার বিবৃতিতে সরকারকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত সময় দিয়েছে, যাতে তারা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের সক্ষমতা দেখাতে পারে। বিবৃতিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক ঘটনা প্রমাণ করেছে যে রাষ্ট্রের একচ্ছত্র অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নীতির বাস্তবতা এখন কঠিন পরীক্ষার মুখে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রকে জবাব দেওয়া অনিবার্য। প্রয়োজনে সৌদি আরবও হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তবে প্রতিরোধ জানিয়েছে, ইমাম হুসাইনের আরবাঈন জিয়ারত শেষ হওয়ার পর তারা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
প্রতিশোধের বিকল্প নিয়ে আলোচনা
ইরাকের একটি প্রতিরোধ গোষ্ঠীর এক নেতা আল-আখবারকে জানান, প্রতিরোধ বাহিনী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জবাবি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং ইরাকের ওপর সৌদি আরবের এই হামলা কোনোভাবেই শাস্তি ছাড়া ছেড়ে দেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক মার্কিন-সৌদি হামলা প্রতিরোধের অস্ত্র সমর্পণ নিয়ে সব ধরনের আলোচনা কার্যত শেষ করে দিয়েছে। যারা এতদিন প্রতিরোধকে নিরস্ত্র করার কথা বলছিল, তারা এখন বাস্তবতার জবাব পেয়েছে। প্রতিরোধের অস্ত্র থাকবে এবং তা কোনো আলোচনার বিষয় হবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নেতা আরও জানান, প্রতিশোধের বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে ইরাকের প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো আলোচনা করছে। এ বিষয়ে তারা প্রতিরোধ অক্ষের অন্যান্য পক্ষের সঙ্গে, বিশেষ করে ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ আন্দোলনের সঙ্গে পরামর্শ করছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি প্রমাণিত হয় যে ইরাক সরকার ও ওয়াশিংটনের মধ্যে এ হামলা নিয়ে কোনো ধরনের সমন্বয় ছিল, তবে দেশটি নজিরবিহীন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটে পড়তে পারে।
ট্রাম্পের দাবি
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলার পর ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, ইরাকে হাশদ আল-শাবির বিরুদ্ধে পরিচালিত এই হামলা ইরাক সরকারের সমন্বয়েই চালানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র অনুতপ্ত হবে
কাতায়েব সাইয়্যিদ আশ-শুহাদা গোষ্ঠীর নেতা হামিদ আল-কাবি বলেন, তাদের শহীদদের রক্ত বৃথা যাবে না এবং আগ্রাসীদের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক জবাব দেওয়া হবে। তবে সেই জবাবের সময় ও পদ্ধতি সামরিক হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, এই হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অনুতপ্ত হতে হবে। যদি আগ্রাসন অব্যাহত থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের স্বার্থ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
জনমত ও সংসদীয় প্রতিক্রিয়া
এই হামলার বিরুদ্ধে ইরাকের জনগণের প্রতিক্রিয়াও ছিল তীব্র। বাগদাদসহ বিভিন্ন প্রদেশে হাশদ আল-শাবির নিহত সদস্যদের স্মরণে কয়েক লাখ মানুষের অংশগ্রহণে শোক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিক্ষোভকারীরা যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন এবং হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন।
সংসদীয় পর্যায়ে কাতায়েব হিজবুল্লাহ ইরাক-সংশ্লিষ্ট হুকুক (অধিকার) আন্দোলনের এক সদস্য জানান, সংসদের জরুরি অধিবেশন আহ্বানের জন্য ৬০টিরও বেশি স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়েছে। ওই অধিবেশনে সৌদি রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার এবং রিয়াদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি তোলা হবে।
তিনি বলেন, এই হামলা ইরাকের সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। তাই বাগদাদ সরকারের উচিত শুধু নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
এদিকে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-ফাতলাওয়ি আল-আখবারকে বলেন, এই হামলা কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়; এর লক্ষ্য ইরাকে সংঘাতের নিয়ম নতুন করে নির্ধারণ করা এবং প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে সরকারকে স্পষ্ট অবস্থান নিতে বাধ্য করা।
আপনার কমেন্ট